অবহেলায় বিলুপ্তির পথে স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন কয়ারপাড়া জামে মসজিদ

অবহেলায় বিলুপ্তির পথে স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন কয়ারপাড়া জামে মসজিদ

গাইবান্ধা প্রতিনিধি : প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যকলার অনন্য এক নিদর্শন কয়ারপাড়া জামে মসজিদ। বর্তমানে যা আমালাগাছী কয়ারপাড়া ঈদগাহমাঠ। ছোট ছোট গোলাকার ইট দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে এ মসজিদ। আকারে ছোট হলেও প্রাচীন চারুকার্যে তৈরি মসজিদটির নকসা ও গম্বুজগুলো বেশ দৃশ্যমান। লোকমুখে প্রায় এক হাজার বছর আগে নির্মিত এ মসজিদের নানা কাহিনি শোনা যায়। তবে সংরক্ষণের অভাবে মসজিদটি প্রায় বিনষ্ট হওয়ার পথে। গাইবান্ধা জেলার পলাশবায়ী উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে বরিশাল ইউনিয়নের আমলাগাছী গ্রামে উন্মুক্ত স্থানে মসজিদটির অবস্থান। দেয়ালের শুভ্র রঙগুলো নষ্ট হয়ে ক্ষয় হওয়া ইটগুলো বের হয়েছে। মসজিদটির একাধীক স্থান ধষে পড়েছে। দেয়ালে র্উদু/ফারসি ভাষার কিছু লেখা আছে যা অষ্পষ্ট। তিনটি দরজা ও উত্তর দিকে একটি ছোট মিনার।
স্থানীয় লোকজন জানান, মসজিদটি একরাতে নির্মিত হয়েছে। আবার অনেকেই বলছেন বাপ-দাদার কাছ থেকে শুনেছি পশ্চিম দিকে থেকে আসা এক দরবেশ সাহেব এই জায়গায় নামাজ পড়তেন। তিনি এই মসজিদ নির্মাণ করেছেন। জনশ্রুতি আছে, এখানে কেউ চুরি বা অসম্মানজনক কিছু করলে অলৌকিকভাবে সে শাস্তি পায়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে তবারক নিয়ে আসেন। সহীহভাবে মানত করলে তা পুরন হয় এবং পুরন হওয়ার অনেক সম্ভাবনা থাকে। ওই গ্রামের বয়োজেষ্ঠ্য আহসান হাবিব খোকন বলেন, ‘সুলতান মাহমুদ এর আমলে এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে প্রতি রাতে সাদা পোষাক পরিধান করে গায়েবী এক ব্যক্তি নামাজ আদায় করে। আশপাশে লোকজনের আনাগোনা পেলে তাকে আর দেখা যায়। প্রতি শুক্রবার এখানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও আসেন মানত করতে।’
স্থানীয় লোকজনের বিশ্বাস, মসজিদ যখন নির্মাণ করা হচ্ছিল তখন ঘন জঙ্গলে পুর্ণ ছিল এই এলাকা। দেয়ালের ওপরের দিকে ফুল-লতার ছবি আঁকা। দেয়ালের ইটের গাঁথুনি অনেক পুরু। মূল মসজিদ দৈর্ঘ্য ১৮ হাত এবং প্রস্থ ৬ হাত। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়ীয়ে থাকা মসজিদটির গম্বুজ ১৫ ফুট উঁচু। মসজিদটি প্রাচীন ও সৌন্দর্যমন্ডিত স্থাপনা হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ দেখতে আসেন। অনেকে একে গায়েবি মসজিদ বলেও দাবি করেন। আমলাগাছী কয়ারপাড়া এই মসজিদের নামকরণ নিয়ে পরিষ্কার তথ্য মেলে না। তবে প্রচলিত আছে খোরাশান নামে এক পীর-দরবেশ এই এলাকায় আসেন এবং এই মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই থেকে মসজিদের খোরা থেকে নামকরণ করা হয় কয়ার মসজিদ। যা পরে কয়ারপাড়া মসজিদ নামে পরিচিতি পায়। মসজিদ কমিটির সভাপতি মো সাদেকুর রহমান জানান, ‘১১০৩-১১০৪ সালের মধ্যে খাঁ বংশের বাহার আলী খাঁন নামে এক কামেল পীর আসেন এবং তার আমলে এ মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্ভাব্য তিনি এটি নির্মাণ করেছিলেন। ১৩২৬ সালের দিকে বড় ভুমিকম্পে মসজিদটির সামনের অংশ মাটির নিচে দেবে যায় দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী এভাবে মসজিদের অংশ পড়ে থাকে। মসজিদটির বেশিরভাগ অংশ মাটির নিচে দেবে যাওয়ায় নামজের জন্য অনুপযোগি হয়ে পড়ে এবং এ অংশটুকুর বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরে এবং ভেঙে পড়তে শুরু করে। ১৯০৫ সালের মাঝামাঝি পূর্ব দিকে ঈদগাহের জায়গা বাড়ানো হয়। সেখানেই ঈদের নামাজের জন্য মাঠ তৈরি করা হয়। ১৯৮০ সালে চারদিকে মাঠটির প্রচীর দেয়া হয়। তবে মসজিদের বাকি অংশে ঝোপজঙ্গলে ছেয়ে যায়। গম্বুজে বটের চারা ও লতাপাতা গজিয়ে ওঠে। প্রাচীন স্থাপত্যকলার নিদর্শন হিসেবে যথাযথ রীতি মেনে যেভাবে সংস্কার দরকার ছিল তা করা হয়নি। মসজিদটি সংরক্ষণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করবো।এখন মসজিদের পুরানো সৌন্দর্যের অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে।’বরিশাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল মান্নান জানান,‘কয়ারপাড়া মসজিদ ঐতিহ্যবাহী। বহু আগে ওখানে মসজিদ ছিল এখন মসজিদটি ধ্বংসের পথে। বর্তমানে মসজিদের জায়গাতে এলাকার লোকেরা দুই ঈদের নামাজ আদায় করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মসজিদ সংস্কারের জন্য বরাদ্ধ দুই লক্ষ টাকা কয়ার পাড়া মসজিদটি সংস্কারের জন্য দেয়া হয়েছে।’পৌরসভা প্রশাসক মেজবাউল হোসেন জানান, ‘মসজিদটির খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। সংস্কার এবং সংরক্ষণ করা যায় কিনা। সংরক্ষণের উপযোগি হলে উদ্যোগ নেয়া হবে।’এদিকে এলকাবাসীর আশা, সংশ্লিষ্টরা মসজিদটির সংস্কার করে সংরক্ষণ করবেন।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *