আমূল সংস্কারের পর দৃষ্টিনন্দন কান্তজিউ মন্দির ও নয়াবাদ মসজিদ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন অসংখ্য পর্যটক

আমূল সংস্কারের পর দৃষ্টিনন্দন কান্তজিউ মন্দির ও নয়াবাদ মসজিদ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন অসংখ্য পর্যটক

খায়রুন নাহার বহ্নি, বীরগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি ঃ বৈচিত্রময় ও নান্দনিকতার ছোঁয়ায় আমূল সংস্কারের পর দৃষ্টিনন্দন কান্তজিউ মন্দির ও নয়াবাদ মসজিদ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে আগত পর্যটকদের ভীড়ে মুখরিত এখন কান্তনগর ও নয়াবাদ গ্রাম এলাকা। দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে ঐতিহাসিক এ মসজিদ ও মন্দির দেখতে আসছেন পর্যটকরা। প্রাচীণ স্থাপত্যের অনন্য এ নিদর্শনগুলো দেখে পর্যটকদের চোখে-মুখে রীতিমত তৃপ্তির ছাপ দেখা যায়। বিশেষ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালের নিরলস প্রচেষ্টায় ওই মসজিদ ও মন্দির অবকাঠামোর যে সংস্কার হয়েছে তা স্থাপনাগুলোকে করেছে নান্দনিক, বৈচিত্রময় ও দর্শনীয়। রাতের আধাঁর নেমে আসার সাথে সাথে আলোক রশ্মি যেন স্থাপনাগুলোকে নতুন যৌবন দিয়ে দেয়। প্রাচীণ এ মসজিদ ও মন্দির তখন হয়ে ওঠে চোখ জুড়ানো স্থাপত্য।
দিনাজপুর জেলা সদর হতে ২০ কিঃ মিঃ উত্তরে এবং কাহারোল উপজেলা সদর হতে ৭ কিঃ মিঃ দক্ষিণ পূর্বে সুন্দরপুর ইউনিয়নে দিনাজপুর-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেপা নদীর তীরে কান্তনগর এলাকায় প্রাচীণ টেরাকোটার অনন্য নিদর্শন কান্তজিউ মন্দির অবস্থিত। কালিয়াকান্ত জিউ অর্থাৎ শ্রী-কৃষ্ণের বিগ্রহ অধিষ্ঠানের জন্য মন্দির নির্মিত হয় বলেই এই মন্দিরের নাম কান্তজিউ মন্দির। প্রায় ১ মিটার (৩ ফুট) উঁচু এবং প্রায় ১৮ মিটার (৬০ ফুট) বাহু বিশিষ্ট প্রস্তর নির্মিত একটি বর্গাকার বেদীর উপর এই মন্দির নির্মিত। শোনা যায়, বেদীর পাথরগুলো আনা হয়েছিল প্রাচীন বানগড় (কোটিবর্ষ দেবকোট) নগরের ভেঙ্গে যাওয়া প্রাচীন মন্দিরগুলো হতে। পাথরের ভিত্তি বেদীর উপর মন্দিরটি ইটের তৈরী। বর্গাকারে নির্মিত মন্দিরের প্রত্যেক বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬ মিটার (৫২ ফুট)। মন্দিরের চারিদিকে রয়েছে বারান্দা। প্রত্যেক বারান্দার সামনে রয়েছে ২টি করে স্তম্ভ। স্তম্ভগুলো বিরাট আকারের এবং ইটের তৈরী। স্তম্ভ ও পাশের দেওয়ালের সাহায্যে প্রত্যেক দিকে ৩টি করে বিরাট খোলা দরজা তৈরী করা হয়েছে। বারান্দার পরেই রয়েছে মন্দিরের কামরাগুলো। একটি প্রধান কামরার চারিদিকে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট কামরা। ৩ তলা বিশিষ্ট এই মন্দিরের নয়টি চূড়া বা রতœ ছিল। এজন্য এটিকে নবরতœ মন্দিরও বলা হয়ে থাকে। ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে ভূমিকম্পে মন্দিরের চূড়াগুলো ভেঙে গেছে। মন্দিরের উচ্চতা ৭০ ফুট।
মন্দিরের উত্তর দিকের ভিত্তিবেদীর শিলালিপি হতে জানা যায়, দিনাজপুরের জমিদার মহারাজা প্রাণনাথ রায় (মৃত্যু ১৭২২ খৃঃ) তার শেষ জীবনে মন্দির তৈরীর কাজ শুরু করেন এবং তার মৃত্যুর পর তার আদেশ অনুসারে দত্তক পুত্র মহারাজা রামনাথ রায় এই মন্দির তৈরীর কাজ শেষ করেন ১৭৫২ খৃষ্টাব্দে। ইট দ্বারা তৈরী এই মন্দিরের গায়ে পোড়ামাটির চিত্রফলকের সাহায্যে রামায়ণ-মহাভারতের প্রায় সব কয়টি প্রধান কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। সে সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন কাহিনী এবং সম্রাট আকবরের কিছু চিত্র কর্ম রয়েছে। অতি সুন্দর ও কারুকার্যময় এই কান্তজীর মন্দির। পোড়া মাটির চিত্র ফলকের এমন সুন্দর ও ব্যাপক কাজ বাংলার আর কোন মন্দিরেই নেই। সারা উপমহাদেশেও আছে কিনা সন্দেহ। ঐতিহাসিক বুকানন হ্যামিলটনের মতে, এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দরতম মন্দির। কান্তজিউ বা শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ ৯ মাস এই মন্দিরে অবস্থান করে এবং রাস পূর্ণিমায় মাস  ব্যাপী তীর্থ মেলা বসে। দেশ-বিদেশ হতে বহু পূণ্যার্থী আসেন এই মেলায় এবং মন্দিরটি দেখতে। মন্দিরটি দীর্ঘদিন যাবৎ সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে ধীরে ধীরে এটি দেখতে আসা মানুষের সংখ্যা কমতে শুরু করে। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল মন্দিরটি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। মূলতঃ পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণে তাঁর এ উদ্যোগ বলে জানা যায়। টেরাকোটা অলঙ্করণের বিস্ময় জাগানিয়া কান্তজিউ মন্দিরকে ঘিরে একটি পর্যটন এলাকা গড়ে তুলতে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা সফলতা লাভ করে। এখন সেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসছেন মন্দির পরিদর্শনে। পর্যটকদের ভীড়ে এলাকায় নতুন প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কর্মজীবী মানুষেরা ফিরে পেয়েছে যেন নতুন জীবন। শুধু তাই নয়, দিনাজপুর জেলা শহর থেকে মন্দিরে যাবার জন্য ঢেপা নদীর উপর তৈরি হয়েছে ব্রীজ। ওই ব্রীজটি না থাকায় প্রায় ১০ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে মন্দিরে যেতে হতো। দেশ-বিদেশের পর্যটকরা আসলে সেখানে থাকার কোন পরিবেশ ছিল না। সে কারনে মন্দিরের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে পর্যটন মোটেলের আকর্ষনীয় রেষ্ট হাউজ। দর্শনার্থীদের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানাতে নির্মাণ করা হয়েছে মিউজিয়াম। কেনা-কাটার সুবিধার্থে পাশেই মার্কেট তৈরি করে এর আশপাশের রাস্তা উন্নয়ন করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী শিব মন্দির ও রাজবেদী সংস্কার করে আমুল পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রবেশ দ্বারে স্থাপন করা হয়েছে তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতি স্তম্ভ। যার নাম দেয়া হয়েছে সিদু কানু চত্তর। এজন্য স্থানীয়রা এমপি গোপালের প্রতি অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন এলাকার মানুষ।

Noabad Mosjid Night Pic (02) 04-11-2018
এই মন্দিরের পাশের পাড়াটিতে অর্থাৎ মাত্র সোয়া কিলোমিটার দুরে টেরাকোটার তৈরি আরেক নিদর্শন নয়াবাদ মসজিদ রয়েছে। পর্যটকরা সেখানে গেলে টেরাকোটায় নির্মিত মসজিদটি না দেখে ফেরে না। নয়াবাদ গ্রামে অবস্থিত হওয়ায় মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে ‘নয়াবাদ মসজিদ’। কান্তজিউ মন্দিরের মত নয়াবাদ মসজিদটির পাশ দিয়েও বয়ে গেছে ঢেপা নদী। ১.১৫ বিঘা জমির উপর নির্মিত এ মসজিদটি প্রাচীণ মুসলিম স্থাপত্যের দর্শণীয় স্থাপনা।
মসজিদের প্রবেশের প্রধান দরজার উপর স্থাপিত ফলক হতে জানা যায়, এটি স¤্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের রাজত্ব কালে ২ জৈষ্ঠ্য, ১২০০ বঙ্গাব্দে (ইংরেজি ১৭৯৩ সালে) নির্মাণ করা হয়। সে সময় জমিদার ছিলেন রাজা বৈদ্যনাথ। যিনি ছিলেন দিনাজপুর রাজ পরিবারের সর্বশেষ বংশধর। এলাকার অধিবাসীদের থেকে জানা যায় যে, ১৮ শতকের মাঝামাঝিতে কান্তনগর মন্দির তৈরির কাজে আগত মুসলমান স্থাপত্যবিদ ও কর্মীরা এই মসজিদটি তৈরি করেন। তারা পশ্চিমের কোন দেশ থেকে এসে নয়াবাদে বসবাস শুরু করে। তাদের নিজেদের ব্যবহারের জন্য এই মসজিদটি তারা তৈরি করে। ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের চার কোনে ১২.৪৫ মিটার ও ৫.৫মিটার আকারের ৪ টি অষ্টভুজ মিনার রয়েছে। দেয়ালগুলির পুরুত্ব ১.১০ মিটার। উত্তর ও দক্ষিণের দেয়ালে একটি করে জানালা রয়েছে। পশ্চিম পাশের দেয়ালে মোট তিনটি মিম্বার রয়েছে যেগুলি মসজিদের তিনটি প্রবেশ দরজা বরাবর তৈরি করা হয়েছে। মাঝের মিম্বারটি আকারে বড়। যার উচ্চতা ২৩০ মিটার এবং প্রস্থ্য ১.০৮ মিটার এবং অপর দুটি মিম্বার একই আকারের। মসজিদটি তৈরির সময় যে সকল টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কারুকার্য ব্যবহার করা হয়েছিল তার অধিকাশংই এখন আর নেই এবং যেগুলি রয়েছে সেগুলিও সম্পূর্ণ অক্ষত নেই। এখানে বর্তমান মোট ১০৪টি টেরাকোটা অবশিষ্ট রয়েছে। এগুলি আয়তক্ষেত্রাকার এবং আকার ০.৪০মিটার ও ০.৩০ মিটার। মসজিদটির পাশে একটি কবর রয়েছে। তবে কবর বা মসজিদে কোন অংশেই এটি সম্পর্কিত কোন তথ্য দেয়া নেই। তবে কথিত আছে যে এটি মসজিদের কোন নির্মাণ শ্রমিকের কবর।
মসজিদটি স্থাপনের আর কোন সংস্কার কাজ হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে তা নিজস্ব ঐতিহ্য হারাতে বসেছিল। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়ে এটিকেও পর্যটন এলাকার আওতায় আনতে স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল মসজিদটিরও আমূল সংস্কারের উদ্যোগ নেন। মসজিদ স্থাপনের পর এটিই প্রথম সংস্কার বলে জানা গেছে। এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এজন্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল এমপিকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। এখন মসজিদের প্রবেশ পথে সুন্দর রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদের অবকাঠামোয় প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়েছে। মুয়াজ্জিনের সুরেলা মাগরিবের আজানের সাথে সাথে চারিদিক থেকে জ্বলে ওঠে বিভিন্ন ধরণের আলোক রশ্মি। যা মসজিদটিকে আকর্ষণীয় ও নান্দনিক করে তুলেছে। এমন সংস্কারে এখন পর্যটকদের ভীড় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। প্রতি শুক্রবার এখানে জুম্মার নামাজ আদায় করতে দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লীরা ভীড় জমাচ্ছেন। নামাজ আদায়ের সাথে সাথে ঐতিহাসিক এ মসজিদটিকে দেখতেই পর্যটকদের এমন ভীড়।
প্রায় প্রতি শুক্রবার নয়াবাদ মসজিদে নামাজ আদায়কারী কাহারোল উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ মামুনুর রশিদ চৌধুরী এ ব্যাপারে জানান, মসজিদের সংস্কার কাজ করায় এখন এ এলাকার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে কান্তজিউ মন্দির সংস্কারের ফলে দেশ-বিদেশের মানুষ আসায় বৃহত্তর দিনাজপুর তথা উত্তরবঙ্গের জন্য এটি অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিবে বলে আমার বিশ্বাস। এলাকার সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এ পর্যটন নগরী গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতœতত্ত্ব বিভাগের আওতায় কান্তজিউ মন্দির, নয়াবাদ মসজিদ সংস্কার ও এর আশপাশের স্থাপনা নির্মাণ নিঃসন্দেহে পর্যটন নগরীকে সমৃদ্ধ করেছে। এটি এলাকার মানুষের জীবন মান উন্নয়নে সহায়ক হবে।
বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ ডি.সি রায় বলেন, অনালোকিত শ্রী শ্রী কান্তজীউ মন্দির আলোকিত হয়েছে। যেখানে যাওয়ার রাস্তাই ছিল না সেই মন্দির আজ পাকা রাস্তা, ব্রীজ, ঝলমলে বিদ্যুত্যের আলোয় আলোকিত এবং পর্যটক ও পুজারীদের পদচারনায় মুখরিত এই তীর্থস্থানের জন্য সত্যিই আমি গর্বিত। অবশ্যই এজন্য এই এলাকার অত্যন্ত জনপ্রিয় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালকে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং তার দীর্ঘ জীবন কামনা করছি।
কাহারোল উপজেলার নয়াবাদ গ্রামের ইউনুস খন্দকার রতন বলেছেন, এলাকার সংসদ সদস্য হিসেবে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের উপকারার্থে কাজ করেছেন মনোরঞ্জন শীল গোপাল। তার এই অভূতপূর্ব উন্নয়নে এলাকাবাসী আনন্দিত ও অভিভূত। এ ছাড়া কান্তনগর এলাকার নবীন দাস বলেছেন, অতীতের তুলনায় এ এলাকায় এখন বিপুল পরিমাণ দর্শনার্থী বেড়েছে। সে জন্য এলাকার মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন হতে শুরু করেছে। তাই উন্নয়নের স্বার্থেই মনোরঞ্জন শীল গোপালকে আবারও এ এলাকার এমপি নির্বাচিত করতে হবে। মন্দির ও মসজিদ পরিদর্শনে আসা পর্যটকদের মধ্যে সূবর্ণা, স্বপ্না, মান্না, নিরঞ্জন, কবিতা রায়সহ অনেকেই জানান, ‘মন্দিরের নান্দনিকতা দেখে আমরা জাষ্ট অভিভূত। আনন্দ প্রকাশের ভাষা আমরা হারিয়ে ফেলেছি।’ টেরাকোটার এ স্থাপত্য ও ইতিহাস জানতে পেরে আমরা সমৃদ্ধ হলাম। আমরা মনে করি- নতুন প্রজন্মও এ থেকে উপকৃত হবে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *