এক সময়ের জনপ্রিয় ‘ড্রিমগার্ল’ খ্যাত সুচরিতা

‘ড্রিমগার্ল’ খ্যাত সুচরিতা

ডেস্কঃ  সুচরিতা আসল নাম বেবী হেলেন।রংপুরের মেয়ে সুচরিতা ১৯৫৮ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। চলচ্চিত্রের প্রতি এতটাই মনোযোগী হয়ে যান যে শিক্ষাগত যোগ্যতাকে অতিক্রম করে গিয়েছে সুচরিতার অভিনয়। মেট্রিকও দেননি তিনি। সুচরিতা বলেন, অভিনয়ের প্রতি এতটাই ঝুঁকি পড়ি যে একাডেমিকভাবে আমি মেট্রিক শেষ করতে পারিনি। কিন্তু তাতে আমার কোনো কিছু যায় আসে না। আমার পড়াশোনা আমার মতোই এগিয়েছে। একাডেমিক স্বীকৃতি না থাকলেও আমি পড়াশোনা চালিয়েছি বাসায়।

১৯৬৯ সালে শিশু শিল্পী হিসেবে বাবুল ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন। নায়িকা হিসেবে স্বীকৃতি ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন ১৯৭২ সালে। ১৯৭৭ সালে আবদুল লতিফ বাচ্চু পরিচালিত যাদুর বাঁশী ছবিটি তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছে দেয়। প্রথম শ্রেণীর নায়িকা হিসেবে জায়গা করে নেন সুচরিতা। রোমান্টিক চলচ্চিত্রে তাঁর সাথে জুটি গড়ে ওঠে ইলিয়াস কাঞ্চন, ওয়াসিম এবং উজ্জ্বলের সাথে। সুচরিতার চমৎকার শারীরিক অবয়ব এবং ফটোজেনিক চেহারা তাঁকে একটা শক্ত ভীত গড়ে দেয়। তিনি একজন সু-অভিনেত্রীও ছিলেন। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির পুরস্কার লাভ করেন শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে।

শাবানা-নাদিমের সন্তান হিসেবেও অভিনয় করেছেন সুচরিতা। পরে নাদিমের সাথে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেন সুচরিতা। সর্বশেষ, প্রজন্মের পরিচিত নায়ক মান্নার নায়িকা হিসেবে কাজ করলেও এখন তিনি শাকিব খান, সাইমন সাদিকদের মায়ের চরিত্রে অভিনয় করছেন।

সুচরিতা বললেন, এফডিসিতে আমি যখন ফাইভে পড়ি তখন থেকেই যাতায়াত করি। বলা যায় তখনই এসেছি, নাদিম ভাই আমাকে কোলে তুলে নিতেন। আমি তাঁকে আঙ্কেল ডাকতাম। যখন তার নায়িকা হলাম তখন আমি কি যেন একটা প্রশ্নে জিজ্ঞেস করি, ‘আঙ্কেল এটা…তিনি আমার মুখে হাত দিয়ে থামিয়ে বললেন উঁহু এখানে আঙ্কেল বলা যাবে না। সেই থেকে আমি নাদিম ভাই বলে ডাকি।

পরে বহু চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করে পেয়েছেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও। কিন্তু সেই পুরস্কার পেলেও আক্ষেপ রয়ে গেছে তার। যখন অভিনয় খুব বেশি বুঝতেন না, সেই বয়সেই ‘জাদুর বাঁশি’ চলচ্চিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন তিনি। দর্শক তার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন ‘জীবন নৌকা’ চলচ্চিত্রেও। কিন্তু দু’টি চলচ্চিত্রের একটির জন্যও তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাননি। পরে চাষী নজরুল ইসলামের হাঙর নদী গ্রেনেড ছবিতে অভিনয় করে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

অনেকটা মনে কষ্ট নিয়েই সুচরিতা বলেন, ‘জাদুর বাঁশি’ চলচ্চিত্রে আমি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাচ্ছি, আমাকে এমনই জানানো হয়েছিল সেই সময়। কিন্তু পরে অন্য একজন ম্যাডাম সেই পুরস্কার পেয়েছিলেন। আমি নাকি পুরস্কার নিয়ে খেলা করবো, মর্যাদাই বুঝবো না পুরস্কারের, সে জন্য আমাকে পুরস্কার দেয়া হয়নি। অথচ নিজের অভিনয় দেখে আমি নিজেই মুগ্ধ হয়েছিলাম। পুরস্কার না পাওয়ার সেই কষ্ট এখনো মনে হলে খারাপ লাগে। সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘কাগজের নৌকা’ চলচ্চিত্রে সুচরিতার বড় বোন বেবী রিটাও অভিনয় করেছিলেন। বড় বোনের শুটিং দেখতে গিয়েছিলেন তিনি এবং তারই বান্ধবী চম্পা। সেখানেই পরিচালক মুস্তাফিজের ‘কুলি’ চলচ্চিত্রে শিশু চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পান সুচরিতা। তখন তার নাম ছিল হেলেন। ‘কুলি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর তিনি শিশু চরিত্রে আরো অভিনয় করেন ‘নিমাই সন্ন্যাসী’,‘ অবাঞ্ছিত’, ‘রং বেরং’, ‘টাকা আনা পাই’, কত যে মিনতি’, ‘রাজ মুকুট’, ‘বাবলু’সহ আরো বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে। নায়িকা হিসেবে আজিজুর রহমানের নির্দেশনায় ‘স্বীকৃতি’, দীলিপ বিশ্বাসের ‘সমাধি’ এবং অশোক ঘোষের ‘মাস্তান’ চলচ্চিত্রে পরপর অভিনয় করেন। একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় এবং মুক্তির পর তার দর্শকপ্রিয়তার কারণে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি সুচরিতাকে। গাজী মাজহারুল আনোয়ারই হেলেন নাম পরিবর্তন করে রাখেন সুচরিতা। সেই যে শুরু হলো নায়িকা হিসেবে তার যাত্রা এরপর থেকে আজ পর্যন্ত অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এ অভিনেত্রী।

চলচ্চিত্রের দুটি মানুষ তার ভীষণ প্রিয়। একজন নায়করাজ রাজ্জাক। অন্যজন ববিতা। সুচরিতা বলেন, ববিতা আপা একজন খাঁটি মানুষ। তার বাসার পাশেই লেকভিউ হাসপাতালে আমার প্রথম সন্তান আবির যখন হলো, তখন যতদিন হাসপাতালে ছিলাম ততদিন তার বাসা থেকে তিন বেলার খাবার পাঠাতেন। তিনিও আসতেন আমার খোঁজখবর নিতে। আরো ভালোলাগার বিষয় হলো ববিতা আপার সন্তান অনিকের কাপড়ই আমার সন্তান আবির প্রথম পরেছে। সিঙ্গাপুরের মাদার কেয়ার থেকে আনা সেই কাপড় প্রথম অনিক পরেছে, তারপর আমার সন্তান। প্রথম মা হওয়ার সময় ববিতা আপার সঙ্গে সেই সব স্মৃতি কোনো দিনই ভোলার নয়। সত্যিই ববিতা আপা একজন মহান নারী।

আশির দশকের প্রথম দিকে ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় প্রেমের বিয়ে হয়েছিল তার প্রয়াত নায়ক জসিমের সঙ্গে। ভালোবাসার সেই সংসারের আয়ু হয়েছিল মাত্র বছর-তিনেক।

ঢালিউডের চলচ্চিত্রের সোনালী সময়ে ‘ড্রিমগার্ল’ খ্যাত সুচরিতা দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসেন ১৯৮৯ সালে। চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী ও ঢাকার কয়েকটি সিনেমা হলের মালিক কেএমআর মঞ্জুর সঙ্গে সুচরিতার এই বিয়েটিও ছিল প্রেমের। তাদের সংসারে পর পর আসে ৩টি সন্তান। সন্তান আর সংসারের ব্যস্ততায় সুচরিতা একসময় ঢালিউড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। পরে অবশ্য আবারও চলচ্চিত্র অভিনয় শুরু করেন তিনি।

দীর্ঘদিন ধরে দুজনের মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় তারা আলাদা বসবাস করছিলেন। ২০১২ সালে কেএমআর মঞ্জুরের সঙ্গে সুচরিতার ডিভোর্স হয়। সেই সঙ্গে ভেঙে যায়, তাদের ২৩ বছরের সংসার। পরে সুচরিতা সাংবাদিকদের বলেন, কেএমআর মঞ্জুরের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নাই এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। সম্পর্কটা কেবল টিকে ছিল কাগজে কলমেই। কেবল কাগজের কোনো সম্পর্কের মূল্য আমার কাছে নেই। এবার কাগজে-কলমে ডিভোর্স হয়ে গেল।

তিন ছেলেমেয়ে, এদের মধ্যে বড় ছেলে পড়াশোনা শেষ করে অস্ট্রেলিয়াতে চাকরি করছে। মেজ মেয়ে মালয়েশিয়াতে সদ্য জার্নালিজমে স্নাতকোত্তর শেষ করেছে। ছোট মেয়ে এবার ‘ও লেভেল’ দেবে।

উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র:

জীবন নৌকা,জনি,রঙ্গীন জরিনা সুন্দরী,ডাকু মনসুর,এখোনো অনেক রাত,হাঙ্গর নদী গ্রেনেড,কথা দিলাম,ত্রাস,দাঙ্গা,নাগর দোলা,দি ফাদার, বাল্য শিক্ষা, বদলা,গাদ্দার,দুনিয়াদারী,মোহাম্মদ আলী,রকি,যাদুর বাঁশী,মাস্তান,তাল বেতাল,সমাপ্তি,জানোয়ার,আলোর পথে,ছক্কা পাঞ্জা,সোনার হরিণ,সোনার তরী,আসামী,তুফান,নদের চাঁদ,ঘর-সংসার,কুদরত,সাক্ষী,আঁখি মিলন,জিঘাংসা,,মায়ের আঁচল,দেনা পাওনা,কার পাপে, নালিশ, হাসনাহেনা, অগ্নিপরীক্ষা,যাদুনগর,মধুমালতী,রূপের রাণী চোরের রাজা,রাজকুমারী চন্দ্রভান,নাগিন,নাগিন কণ্যা, নাগরাণী, গঙাযমুনা, জলপরী, আগুন পানি,রঙিন আলাল দুলাল,ব্জ্রমুষ্ঠী,বীরপুরুষ,সেলিম জাভেদ,অকর্মা,আমিই শাহেনশা, মারকশা, লিনজা, মহল, সালতানাত, হালচাল, আশ্রয়, কুসুমকলি,চার সতীনের ঘর,ইনসাফ,ইশারা,মেঘ বিজলী বাদল,বাদল,ওস্তাদ সাগরেদ,সংসার সীমান্তে,কাজল লতা,ফেরারী বসন্ত, মা আমার চোখের মনি,নয়ন ভরা জল,ফুলেশ্বরী,লাগাম,স্মাগলার,আপনজন,গাঁয়ের ছেলে, রংবেরং, স্বীকৃতি, অপেক্ষা, অজান্তে, সিকান্দার, হারানো সুর,নিশান,আল হেলাল,শাহী চোর,ধর্ম আমার মা,নিকাহ্, গৃহলক্ষী,বনবাসে বেদের মেয়ে জোসনা,টাকা,জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার,মাটির মায়া,মাটির কোলে,মা আমার বেহেশত,কত যে আপন,লাখে একটা,রঙীন বিনি সূতার মালা,পরান পাখী, আয়নামতি, শত্রু, মহেশখালীর বাঁকে, দুই বোন,অন্যায়,উদ্ধার,মিয়া বাড়ীর চাকর,চাচ্চু আমার চাচ্চু,সোনার ময়না পাখী,নাম বদনাম, মোহন বাঁশি, চিৎকার, চরমপত্র, আওয়ারা, হিসাব চাই, পিতার আসন, স্বামী স্ত্রীর ওয়াদা, ঘর আমার ঘর,প্রবেশ নিষেধ, লাল সবুজের পালা, কলমিলতা, বাঁধনহারা,মাষ্টার সামুরাই,যাদুনগর,

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *