কবি ময়নুল হাসান ছিলেন চুয়াডাঙ্গার সাহিত্যর বটবৃক্ষ

কবি ময়নুল হাসান ছিলেনচুয়াডাঙ্গার সাহিত্যর বটবৃক্ষ

মোমিনুল ইসলাম বিপু:কবি ময়নুল হাসান ১৯৬২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জ আলমডাঙ্গা জন্মগ্রহণ করেন। বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ শামসুল হক মাতা রিজিয়া খাতুন পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মেজো ছিলেন শিক্ষা জীবনের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনের ছিলেন একজন সফল ব্যাংকার সোনালী ব্যাংক চুয়াডাঙ্গা শাখার সিনিয়র অফিসার হিসাবে কর্মরত ছিলেন।১৯৮৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর আলমডাঙ্গার মেয়ে শাহানা হাসান রেবার সাথে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসার জীবনে কবি ময়নুল হাসান এক সন্তানের জনক সন্তান জনপ্রিয় কবি ও গল্পকার মোহনা হাসান প্রেমা একমাত্র নাতনী রূপকথা হাসান অপ্সরা। উল্লেখ্য গত ২ জানুয়ারি ২০১৯ কবি ময়নুল হাসান হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রথমে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল ভর্তি হন পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয় ঢাকার গ্রীন লাইফ হসপিটাল এ আইসিওতে থাকা অবস্থায় ৭ ই জানুয়ারী ২০১৯ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ময়নুল হাসান একাধারে ছিলেন কবি, কলামিস্ট, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, ও দক্ষ সাহিত্য সংগঠক, চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরলসভাবে লিখেই চলেছিলেন কবি ময়নুল হাসান। চুয়াডাঙ্গা জেলার সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র চুয়াডাঙ্গার সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে গেলে প্রথমে যে নাম টি আসে কবি ময়নুল হাসান। বাংলা সাহিত্যের অলংকার সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের কাছের ও পছন্দের মানুষ ছিলেন, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক কবি ময়নুল হাসানের কবিতা শুনে মুগ্ধ হতেন এবং খুব প্রশংসা করতেন। ২০১২ সালে কবি ময়নুল হাসানের নিমন্ত্রণে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক চুয়াডাঙ্গাতে ময়নুল হাসানের বাসাবাড়িতে বেড়াতে আসেন। ২৩ শে নভেম্বর ২০১২ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলা লেখক সংঘের পক্ষ থেকে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক কে দেয়া হয় বিশেষ সম্মাননা। কবি ময়নুল হাসান ওপার বাংলা ও ঢাকার বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকদের সাথে ছিল নিবির সম্পক। ২০১৬ সালে অমর একুশে বইমেলায় ঢাকার জনপ্রিয় কবি চঞ্চল দেবনাথ এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ” একাকিত্বের ছায়া সঙ্গী ” বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন কবি ময়নুল হাসান। অপ্রতিরোধ্য প্রেমের কবি নামে খ্যাত ময়নুল হাসান ২০১৩ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ” মাধবী ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ” অমর একুশে বইমেলায় দেশবরণ্য শুদ্ধস্বর প্রকাশনী থেকে প্রকাশ পেয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলা সহ সারাদেশে ব্যাপক সাড়া পায়। ২০১৪ সালে কবি ময়নুল হাসানের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ” যদি ভালোবাসা দাও” দেশের শীর্ষ থাকা অনন্যা প্রকাশনী থেকে অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশ পেয়ে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ২০১১ সালে চুয়াডাঙ্গা,মেহেরপুর­,
ঝিনাইদহ, মিলে বৃহত্তর আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠিত ” চুয়াডাঙ্গা জেলা লেখক সংঘের ” প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল ছিলেন। চুয়াডাঙ্গা জেলা লেখক সংঘের প্রাণপুরুষ ছিলেন কবি ময়নুল হাসান। ময়নুল হাসান সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা সমূহ হিল্লোল, সন্দীপন, উদ্দীপন, সৌরভ, জয়ন্তী, ও প্রতিধ্বনি প্রকাশিত হয়েছে। ময়নুল হাসান সম্প্রতি কিছুদিন আগে দৈনিক নতুন খবর পত্রিকায় “নৌকা ” ও ” বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়-স্বজন ” শিরোনামে কলাম লিখে বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন। চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুন্সী আবু সাইফ ও চুয়াডাঙ্গা সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ড. এম এ রশিদ কবি ময়নুল হাসানের কবিতা খুব প্রশংসা করতেন। কবি ময়নুল হাসান ছিলেন চুয়াডাঙ্গার সাহিত্যের বটবৃক্ষ। চুয়াডাঙ্গা জেলা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কবি সাহিত্যিক কে একত্রে সংগঠিত করে একটি প্লাটফর্মে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন । ময়নুল হাসানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রতিভা বিকাশের জন্য চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কবি সাহিত্যিকদের স্বরচিত কবিতা, ছড়া, গল্প, নিয়মিত প্রকাশ করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। শুধু তাই নয় কবি-সাহিত্যিকদের আরো উজ্জিবিত করার জন্য চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত সাহিত্য পাঠের আসর প্রতিধ্বনি অনুষ্ঠিত হতো। বহু দুর দুরান্তে থেকে আসা কবি সাহিত্যিকগণ চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের কাঁনায় কাঁনায় ভরে যেত। ময়নুল হাসানের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা এই মুখরিত হত সাহিত্য পাঠের প্রতিটি আসর, কবি সাহিত্যিকদের রচিত লেখার উপর আলোকপাত করতেন কবি ময়নুল হাসান, এখান থেকে কবি সাহিত্যিকগণ লেখার অনুপ্রেরণা পেতেন। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা অনেক দরিদ্র কবি সাহিত্যিক কে ময়নুল হাসান যাতায়াতের খরচ দিয়ে থাকতেন। ময়নুল হাসান একটা কথায় বলতেন ” সব ব্যয় না কিছু মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ ব্যয় হিসাবে ফিরে আসে ” । ময়নুল হাসান ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রতিভাকে লেখনির মাধ্যমে সমাজে তুলে ধরতেন দামুড়হুদা থানার চিৎলা গ্রামের নিরক্ষর কবি আবদুল হামিদ ময়নুল হাসান এর আবিষ্কার। নতুন প্রজন্মকে শিল্প-সাহিত্যের দিকে অগ্রসর করার জন্য কবি ময়নুল হাসান বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যার মধ্যে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, শিক্ষার্থীদের মাঝে হস্তলিখন, চিত্র অংকন, কবিতা, আবৃতি, রচনা লিখুন, ইত্যাদি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে প্রথমে থানা পর্যায়ে বাছাই করে পরবর্তিতে জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জেলার শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত করে শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরস্কার ও সার্টিফিকেট সনদ প্রদান করে আলোচনায় আসেন। কবি ময়নুল হাসান এবার ২০১৯ সালে অমর একুশে বই মেলায় চুয়াডাঙ্গা জেলার একশো জন কবির কবিতা নিয়ে ” শত কবির শ্রেষ্ঠ কবিতা ” শিরোনামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করতে যাচ্ছিলেন বইটির কাজ প্রক্রিয়াধীন। কবি ময়নুল হাসান ছিলেন বিনয়ী, সদালাপী, একজন আলোর মানুষ, কবি মরিনি বেঁচে থাকবেন অসংখ্য ভক্তের মনে। কবি বেঁচে থাকবেন তার রেখে যাওয়া সৃষ্টির মাঝে সকলের অন্তরে।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *