গরুর লাম্পি স্কিন রোগে ক্ষতির আশঙ্কায় নীলফামারীর কৃষক

গরুর লাম্পি স্কিন রোগে ক্ষতির আশঙ্কায় নীলফামারীর কৃষক ও খামারিরা,মৃত্যু ৯


জেলা প্রতিনিধি নীলফামারী॥ক্যাপরী পক্স ভাইরাজের সংক্রমনে নীলফামারীর ছয় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে,ওয়ার্ড ও গ্রামে সহ¯্রাধিক গবাদি পশু আক্রান্ত হয়েছে। কোরবানীর ঈদের আগেই এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় বিপাকে ও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক-খামারিরা।সোমবার(২২ জুন) জানা গেছে সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর গ্রামে ৫টি, জেলা সদরের বাহালিপাড়া গ্রামে ২টি ও কিশোরীগঞ্জ উপজেলার নিতাই গ্রামে ২টি সহ মোট ৯টি গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
সদর উপজেলা জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা জানায়, ক্যাপরী পক্স ভাইরাসের মাধ্যমে ‘লাম্পি স্কিন’ নামের রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। এর সুনির্দিষ্ট কোন কিকিৎসা নেই। লক্ষন দেখে (সিড্রোমেটিক ট্রিটমেন্ট) আক্রান্ত পশুকে পেনিসিলিন, এন্টি হিস্টামিন ও জ্বড় হলে প্যারাসিটামল দিয়ে ভাল ফলাফল পাওয়া যায়।এন্টিসেপটিক হিসেবে খাবার সোডা পরিমান মত পানিতে মিশিয়ে আক্রান্ত পশুর শরীর পরিস্কার রাখার পরামর্শ দেন খামারীদের।
জেলা সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাহালী পাড়া সরকার পাড়া গ্রামের কৃষক সেকেন্দার আলী জানায়, আমার তিনটি গরু ওই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এ ছাড়াও এই গ্রামের প্রত্যেক বাড়ীতে এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে শতাধিক গরু। গরু তিনটির পিছনে ১০ হাজার টাকা খরচ করেও সুস্থ হয়নি।
একই পাড়ার আশরাফ আলী জানান, খামারীসহ ব্যক্তি পর্যায় কোরবানীর জন্য পালন করা গবাদী পশুর মধ্যে নতুন এই ভাইরাসের সংক্রমন দেখা দিয়েছে। আবার অনেকেই বাদ্য হয়ে আক্রান্ত পশু বিক্রিও করছে। তিনি জানান, এই পাড়ায় কিছুদিন আগে মঞ্জুরুল নামে এক কৃষকের ৭০ হাজার টাকা দামের শাহি ওয়াল জাতের একটি গরু ও সুবল চন্দ্র রায়ের একটি বকনা বাছুর মারা গিয়েছে। তারা গরু মরার শোকে কাতর। তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রাণী সম্পদের লোকজনকে খবর দিলেও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়।
কৃষক মঞ্জুরুল আলম জানায়, গত ১৫ দিন আগে চামড়া ফুলা রোগে আক্রান্ত হয়ে আমার একটি শাহী ওয়াল জাতের গরু মারা গিয়েছে। গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিয়ে কোন ফল হয়নি। টাকাও খরচ হয়েছে প্রায় ৫-৭ হাজার। তবুও গরুটিকে বাঁচাতে পারিনি। যার বাজার মূল্য ছিল প্রায় ৭০ হাজার টাকা। গরুর মুত্যতে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। সুবল চন্দ্র রায়ও একই কথা বলেন। তারা দুইজনে প্রণোদনার দাবি জানান।
উপজেলার ইটাখোলা ইউনিয়নের সিংদই গ্রামের গৃহিনী আনোয়ারা বেগম, লতিফুর রহমান জানান, কোন বাড়ী বাদ নেই সবার গরুর অসুখ হয়েছে। উপসর্গের কথা জানতে চাইলে বলেন, প্রথমে জ্বড় হয় তারপর গুটি গুটি হয়ে ফুলে যায়। তারপর ঘা হয়ে পেকে ফেটে গিয়ে পুঁজ বের হয়। সাথে কাঁপুনি ও ব্যাথা অনুভব হয়। তারা অভিযোগ করে বলেন, সরকারী ডাক্তারকে ফোন দিলে বলে, কোন দিকে যাব ভাই, সবদিকে একই অবস্থা। বারবার ফোন দিয়েও দেখা মেলিনি সরকারী ডাক্তারের।
উপজেলার পঞ্চপুকুর ইউনিয়নের দিঘলটারী গ্রামের কৃষক আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রতিটি বাড়ীতে এই রোগ দেখা দিয়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের পর গ্রাম। গরু নিয়ে বিপাকে পড়েছে মানুষ। তিনি জানান, করোনা পরিস্থিতে টাকা পয়শা হাতে না থাকায় আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পশুর মালিককে। দেখা মেলেনি সরকারী চিকিৎসকের।
জেলার সৈয়দপুর উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রাশেদুল হক মুঠোফোনে জানান, এবারে নতুন এই ‘লাম্পি স্কিন’ রোগটি দেখা গিয়েছে। মাঠ পর্যায়ে মেডিকেল টিম কাজ করছে। পাশাপাশি গোট-টিস্যু ভ্যাকসিন পশুর ওজন ভেদে প্রতিটি গরুকে ২-৩ মিলিঃ করে দেওয়া হচ্ছে। আক্রান্ত পশুকে লক্ষন দেখে চিকিৎসায় ভাল ফল পাওয়া যায়।
উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের ছইল পলি পাড়া গ্রামের মকবুল হোসেন শাহ জানান, এই রোগে ভূল চিকিৎসায় আমার একটি গরু মারা গেছে। যার বাজার মূল্য ৫৫ হাজার টাকা মাত্র।
সদর উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা শাহিদুল ইসলাম কৃষকের সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ভ্যাপসা গরম আর অনাবরত বৃষ্টির ফলে ‘লাম্পি স্কিন’ রোগটি স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। জনবল সংকটের কারনে কিছুটা বিলম্ব হলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনটি ভ্যাটেনারী মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এতে তিনজন ডাক্তারের নেতৃত্বে উপজেলার পৌরসভাসহ ১৬টি ইউনিয়নে গোট-টিস্যু ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, নীলফামারী সদরে ১ লাখ ৫০ হাজার গরু রয়েছে।এর মধ্যে ১৪৫ টি গরুর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।অপরদিকে জেলার ডিমলা,ডোমার,জলঢাকা,সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও এলাকাতেও এ রোগের প্রাদুর্ভাব দিনে দিনে বেড়েই চলেছে বলে স্থানীয় বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে।এতে আক্রান্ত গরু গুলোর মালিকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।এলাকার কৃষক-খামারিরা সহ সাধারন মানুষেরা গরু পুশে(লালন-পালন করে)মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন।তারা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তাদের গুরুত্ব সহকারে ও আন্তরিক ভাবে কৃষক,খামারিদের সাথে যোগাযোগ করে নিয়মিত আক্রান্ত গরু গুলোর এই রোগ প্রতিরোধে এলাকাভিত্তিক চিকিৎসা সেবা পৌছে দেবার আহ্বান জানিয়েছেন।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. মোনাক্কা আলী জানান, প্রায় এক মাস ধরে এই ক্যাপরী পক্স ভাইরাসটি গ্রাম অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। এই অসুখটিকে ‘ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ বলে জানিয়েছেন বিষেষজ্ঞরা। এই রোগে আক্রান্ত পশুর চামড়া ফুলে গোটা গোটা হচ্ছে। পরে তা ঘায়ে পরিনত হয়ে ফেটে রস বের হয়। এমনকি পশুর জ্বড় হচ্ছে। তিনি জানান, রোগ প্রতিরোধে মশা, মাছি থেকে পশুকে দূরে রাখতে মশারী ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *