চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা

চীন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা

শাহিনুর ইসলামঃ বেইজিং নরমাল ইউনিভারসিটির (বিএনইউ) ক্লাস ঠিক ৫টায় শেষ হলো। বাংলাদেশ সময় তখন তিনটা। তার আগেই রাতের (ডিনার) খাবার আনা হয়েছে। সুন্দর প্যাকেটে করে সাজানো, আমরা প্রত্যেকে সারিবদ্ধভাবে নিলাম। প্যাকেট খুলে দেখি, সব কাচা সবজি। বাঙালী মেয়েদের রান্না করা খাদ্যের মতো নয়। সব সবজি সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সেদ্ধ।

পাশ থেকে মফিজুর সাহেব বললেন, এসব কি খেতে পারবেন? আজকের ম্যেনু কি জানেন? আমি না বুঝেই বললাম, ওপর ওয়ালা আমার জিব্বায় যে স্বাদ দিয়েছে, মুখে যা দেই তাই অমৃত। মফিজ সাহেব আইসিডিডিআর’বির একজন গবেষক। গালভরা খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, বেশ ভূষায় অগোছালো হলেও তিনি বেশ স্বজ্জন এবং কাজ পাগল মানুষ।

তিনি শুনে হালকা হেসে বললেন, এটা কিসের মাংস চিনেন? তার কথা শুনে প্যাকেটের দিকে চাইলাম। সামান্য লাল এবং তেল চকচকে মাংস। গন্ধহীন। মনে হচ্ছে- বেশ স্বাদের হবে। এবারে দৃষ্টি তুলে বললাম, গরু নয়তো মহিষ। আমার সরল উত্তরে এবারো হেসে পাশের সতীর্থ মও লিও শ্যেনকে ইশারা করলেন।

ইংরেজিতে জানতে চাইলেন, শ্যেন, এটা কিসের মাংস? ‘ইউনিভার্সিটি সেইন মালয়েশিয়া’ থেকে সে জিও ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি করছে। তরুণ বয়সের হওয়ায় আমাদের সঙ্গে তার বিভিন্ন বিষয়ে বেশ মিলেছে। সে ভিষণ আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে এলো।

চীন-জাপানিরা সব খাবার (তরল ছাড়া) দুটি কাঠি দিয়ে তুলে খায়। ভিষণ সুন্দর কাঠি। কাঠি দিয়েই নির্বাচন হয় চীনের পরিবারিক ঐতিহ্য। সোনা, রুপা, কাঠ এবং বাঁশের তৈরি সুন্দর কাঠি। কালো কাঠের তৈরি দুটো কাঠি আমিও পেয়েছি।

কালো চকচকে যেন মেয়েদের চুল বাঁধার কাঠি। যেন আমার মায়ের হাতে রান্নার কাজে অতি ব্যবহৃত ‘লাকড়ি’। উত্তরাঞ্চলের মেয়েরা শাক, সবজি এবং বিভিন্ন ধরনের রান্নায় লাকড়ি ব্যবহার করে। অতি ব্যবহারে যেন তেল চকচেক ঠিক বাঁশের কাঠির মতো হয়েছে। এ সময় অনেক আগ্রহ নিয়ে মাথার ওপরে এসে দাঁড়ালেন ইরানী সুন্দরী মেয়ে এলনাস রোসান। চোখে-মুখে অনেক তার প্রশ্ন।

জানতে চাইলাম, রোসান কোন সমস্যা? কমলা রঙয়ের পাতলা শরীর দেখে বোঝা দায়, তার শরীরের বয়স কতো? আগ্রহ আর বিষয়ভিত্তিক কৌতূহল দেখে ধারণা হলো, তার মনের বয়স ১৯।
সে জার্মানীর ইউনিভার্সিটি অব হামবুর্গ থেকে এবারে পিএইচডি করেছে। সে হেসে জড়ানো ইংরেজিতে কিছু জানতে চাইল। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমার বিস্ময় দেখে বাঙালী মেয়ের মতো সেও খানিকটা লজ্জ্যা পেল।

এ সময় আমার মনে হলো- আমি এখনো মূর্খ রয়ে গেলাম, আজো শিক্ষিত হতে পারলাম না। ঠিক যেমনটা বাংলাদেশের অধিকাংশ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র হাতে নিয়ে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন। ইংরেজি এমন বর্ণমালায় লেখা ‘প্রেসক্রিপশনের’ রহস্য উদ্ধার করা কঠিন। যদিও পরে তার (রোসান) সঙ্গে আলাপে বেশ বন্ধুত্ব হয়েছে। বাঙালী মেয়ের মতো সেও লজ্জ্যা পেলে সামান্য হাসে।

শ্যেন মাংসের একটি টুকরা কাঠি দিয়ে তুলে মুখে দিয়ে যেন মহাতৃপ্তির স্বাদ পেল। প্রায় ১০ সেকেন্ড পরে হেসে জানানো- পুওর। তুমি কি এটা পছন্দ করো না? অনেক ভালো হয়েছে। তার কথায় আমি না হেসে পারলাম না। তাকে স্বাগত জানিয়ে বল্লাম, তোমার ভালো লাগার কথা জেনে আমারো খুব ভালো লাগছে। কিন্তু আমি মুসলিম, খেতে পারবো না। মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থে শুকরের মাংস খেতে মানা।

বলতেই চিনা এই যুবকের মুখ মলিন হলো। তাৎক্ষণিক সে ‘ছু.. রি’ বলে ছুটে গেল আয়োজন লিনজুর কাছে। একটু পরেই হাজির হলো- সবজি, ভাত এবং মাছ। তার সঙ্গে দেয়া হলো অদ্ভুত রকমের সাদা রঙ্গের দুটি রুটি, দই এবং পিছ ফল। ফলের স্বাদ আমাদের দেশীয় পেয়ারার মতো, তবে পেয়ারা নয়। পাশ থেকে মফিজ সাহেবের হাসি দেখে আমিও কিছুটা হাসলাম।

চীনারা দেশের আইনের মতোই ধর্মীয় বিধান কঠোরভাবে মেনে চলেন। অন্যকোন ধর্মের লোক তার দ্বারা কষ্ট পাবেন, এটা আইনসিদ্ধ নয়। আমাদের কাছে অদ্ভুদ, তবে চীন দেশে চলমান এমন কিছু আইনের কথা জানালো সে।

সুন্দর রাস্তার পাশে অতি সুন্দর করে সাজানো দোকানগুলো হলো- মদের দোকান। ঝকমকে আলো। যেন সোনায় খচিত ছোট্ট সোনার ঘর। ভেতরে লাল-নীল বাতি। ভেতরে সাদা আর গোলাপী রঙয়ের মানুষ। সোনার পেয়ালায় পান করে সুরা। যতো খুশি।

তবে সড়কে বা ভেতরে পাগলামী বা মাতলামী করা চলবে না। হলে তাৎক্ষণিক কঠোর সাজা। সুন্দর ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন পথ চলতে চলতে সে জানাল।

হঠাৎ আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল- কে সাজা দেবে? তোমার দেশে তো পুলিশ নেই। কাল থেকে দেখছি, সড়কে একটা পুলিশও দেখলাম না। ভাগ্যিস হাসতে হাসতে বলেছি। চীনারা নাকি কথা কম বলে।

তার কারণ হিসেবে জানলাম, যাতে কথা কম বলতে হয় এবং সময় বাঁচানো যায়- সেজন্য বাংলা বর্ণমালার মতো তাদের কোন বর্ণমালা নেই। একটি বর্ণ একটি ওয়ার্ড বা শব্দ। একটি ওয়ার্ডে তাদের একটি বাক্য। ইংরেজিতে তিন পৃষ্ঠায় লেখা একটি চিঠি চীনা ভাষায় অর্ধেক পৃষ্ঠার সমান। বিস্ময়কর তথ্য!

পাকা সড়কের মাঝখান দিয়ে আইল্যান্ডে বাংলাদেশের মতো গাছ লাগানো নেই। ঝকমকে লাল গাড়ি, সব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশের রাজধানীতে চলমান গাড়ির সামনে লেখা যেমন স্থানের নাম বাংলা-ইংরেজিতে থাকে, তেমন নেই। শুধু নম্বর দেয়া রয়েছে। সেখানে একটি ইংরেজি বর্ণও নেই। ম্যাগ ডোনাল্স এবং কেএফসি ছাড়া সারা বেইজিং শহরে ঘুরে চীন দেশীয় একটি দোকানেও চোখে পড়েনি ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড।

প্রায় দশজনের একটি দল। আমরা হাঁটছি। পেছন থেকে ইলনাস রোসান এগিয়ে এসে বল্ল, তুমি কি সাংবাদিক? উত্তর দিতেই বল্ল, তুমি নাকি, পার্কারের ইন্টারভিউ করতে যাচ্ছ? আমার ইন্টারভিউ করবে, বলেই হেসে দিল। এরপরই নানান কথায় শুরু হলো বন্ধুত্ব।

চলছি হাজার বছর ধরে চলমান বিখ্যাত কিছু স্থাপনা দেখতে।
প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে হ্যাভেন অব ট্যাম্পেল দেখতে যাচ্ছি।

প্রাইভেটকারে ফিলিপাইনের মি. বেন জানতে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে। আমাদের দেশের জন্মহার, ছোট্ট আয়তনের ১৬ কোটি মানুষের বাস শুনে সে অবাক। দেশটি সমতল এবং নাতিশীতজ্ঞ জেনে সে আরো অবাক। জানতে চায় তোমাদের দেশ খুব সুন্দর তাইনা! সে বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধুর নাম শুনেছে, ভ্রমণে আসতে চায়। আমিও অভিনন্দন জানালাম।

দ্রুত গতীতে চলছে গাড়ি। নেই কোন যানজট। ডান পাশ থেকে ছুটে চলেছে লাল রঙ্গের বড় গাড়ি। বাংলাদেশের গাড়ির মতো ভেতরে গিজগিজ করা লোক নেই। সবাই সিটে বসে আছে। রাস্তায় নেই পুলিশ। সামনের সিটে বসা ছাদেকুল ইসলাম তালুকদারকে বল্লাম, পুলিশ কোথায়, চোখে পড়েনা।

তিনি হেসে বললেন, এটা বাংলাদেশ নয়। মোড়ে-মোড়ে লাঠি হাতে পুলিশ থাকবে। সব ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ চলছে। বিশ্বে চীন একমাত্র দেশ, যেখানে বিদ্যুতের মাধ্যমে সড়কে বাস চলে। জার্মানীতে চেষ্টা করা হয়েছিল, পরে থেমে গেছে।

হ্যাভেন অব ট্যাম্পেলের সামনে এসে নামলাম। শতাধিক বছরের পুরনো বাড়ি। ঝকঝকে। ঠিক লাল রঙ্গের বাড়ি। চোখ জুড়িয়ে যায়।

কিন্তু মাথার ভেতরে ঘুরছে, শতকোটি মানুষের বাস যে দেশে, সেখানে সড়কের পাশে ডাস্টবিন পেলাম না। বাংলাদেশের রাজধানীতে যেমন মৌচাক, মালিবাগ ও মতিঝিলের ব্যস্ত সড়কের পাশে ডাস্টবিন। এখানে নেই যানজট, ডাস্টবিন।

কয়েকদিন পর-পর শুনি, দেশের বড়-বড় আমলা ও মন্ত্রীরা চীন ভ্রমণে আসেন। তারা কি এসব দেখেন? নীরব, পরিচ্ছন্ন সড়ক। সড়কের পাশে নেই ডাস্টবিন, নেই দুর্গন্ধ। নগরকর্তা মেয়র এসব কি দেখেন? কোথাও পেলাম না রাজনীতি নিয়ে বিশেষ আলোচনা।

হঠাৎ মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, এখানে কি মহাসড়ক বন্ধ করে মিছিল করা হয় না? পাশ থেকে ছাদেকুল সাহেব হেসে বললেন, সাংবাদিক সাহেব এটা চীন দেশ। আমাদের মন্ত্রীরা এখানে বিনোদনে আসেন, মার্কেটিং করেন। অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশ সাজাতে নয়।
ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। গোলাপী এবং সাদা বর্ণের মুখগুলো ধীরে ধীরে কালো হতে থাকে। দেখলাম একটু দুরে সেই ইরানী সুন্দরী রোসান উদাস হয়ে বসে আছে। বাঙালী মেয়ের মতো চুল ছেড়ে মাথা নিচু করে আছে।

ধীরে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটু পরে রোসান জানালো, তার একটি সোনার বাবু আছে। সে তুর্কি এবং ইংরেজিতে ভিষণ কথা বলতে পারে। সুন্দর মোবাইলে তুলে রাখা ভিডিও দেখিয়ে বল্ল, সে তার মাকে খুব ভালোবাসে। এখন তার বাবার কাছে জার্মানীতে আছে।

ইরানী মেয়ে রোসান। জার্মানীতে পড়তে গিয়ে পরিচয়, তারপরে বিয়ে। জার্মান দেশের নাগরিককে বিয়ে করায় বাবা-মা অসন্তুষ্ট। তার সোনার ছেলেটার কথা খুব মনে পড়ছে। সন্ধ্যায় আলোতে দেখছি গাল বেয়ে নামছে চকচকে জল।

একটু পরে ক্লান্ত হয়ে ছুটে এলেন মফিজ সাহেব। তার পাশে ছাদেকুল ইসলাম তালুকদার। তিনি কানাডিয়ার বিখ্যাত কোম্পানির বাংলাদেশি প্রকৌশলী।

বুঝলাম : বাঙালী মেয়ে এবং ইরানী মেয়ের মধ্যে আবেগের পার্থক্য কি? সেও আবেগে কাঁদে। তারও রয়েছে ভালোবাসার ক্ষুধা। বাবা-মাকে ছেড়ে দুরে থাকায় তারও মন কাঁদে এবং কাঁদায়।

পৃথিবীর সব মানুষের অনুভূতি কি বাংলা সিনেমার গল্পের মতো!

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *