নীলফামারীতে নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাজারের কেনা প্রশ্ন দিয়ে নেওয়া হল অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা

নীলফামারীতে নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাজারের কেনা প্রশ্ন দিয়ে নেওয়া হল অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা

ডোমার (নীলফামারী) প্রতিনিধি ঃ শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড । যে জাতি যত শিক্ষিত সেই জাতি তত উন্নত, বর্তমান সরকার শিক্ষাকে দেশের প্রান্ত থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুফলতা পাওয়ার যে অধিকার তা নাগরিকদের নিশ্চিত করতে সরকারের সদিচ্ছার কোন প্রকার কমতি নেই। সরকারের নীতিমালা অনুসারে পরীক্ষা পদ্ধতি স্ব-স্ব বিদ্যালয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করবে। কোন অবস্থাতেই বাহির থেকে প্রশ্নপত্র ক্রয় করে পরীক্ষা নেওয়া যাবে না । কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর প্রধান, নীতিমালাকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে বাজারের স্বল্প মুল্যে কেনা রেডিমেট প্রশ্নপত্র দিয়ে এবারে ২০১৯ অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষা চালিয়ে দিলো ।

কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রধান গনের সাথে কথা বললে জানান , আমরা নিজেই প্রশ্ন পত্র তৈরি করেছি, তবে পান্ডু লিপি দেখতে চাইলে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও দেখাননি। শিক্ষকতার মহান পেশাটিকে আজ সৎ ইচ্ছার অভাবে গলা টিপে মেরে ফেলছে কিছু বিপথগামী শিক্ষক । জানা যায় পরীক্ষা ফি বাবদ ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে প্রায় স্কুলেই ২০০ হতে ৩০০ শত টাকা নেওয়া হয়েছিল । কিন্তু প্রশ্নপত্রের মান নিম্ন , নিম্ন মানের কাগজ, দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়।

ডোমার উপজেলার আটিয়া বাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় এর সাথে সোনারায় উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর গণিত সৃজনশীল প্রশ্ন , মাহিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর বিজ্ঞান সৃজনশীল প্রশ্নের সাথে মীরজাগঞ্জ দ্বিমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাথে নবম শ্রেণীর বিজ্ঞান সৃজনশীল প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া যায় । সকল প্রশ্নের সেট ঝউ । বড়রাউতা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাথে সোনারায় উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় সৃজনশীল প্রশ্নের সেট ঝউ , এবং মাহিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্ব সভ্যতা সৃজনশীল প্রশ্নের মিল রয়েছে। প্রশ্নের সেট কউ । বাগডোকরা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় , মিরজাগঞ্জ দ্বিমূখী উচ্চ বিদ্যালয় , বড়রাউতা উচ্চ বিদ্যালয় এবং শালমারা বছিরননেছা স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণীর বাংলা প্রথম পত্র সৃজনশীল প্রশ্নের হুবহু মিল রয়েছে । সকল প্রশ্নের সেট ঝউ । এছাড়াও বাগডোকরা নিমোজখানা স্কুল এন্ড কলেজ এর সাথে হংসরাজ দ্বিমূখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাথে দশম শ্রেণীর পৌরনীতি ও নাগরিকতা সৃজনশীল প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া যায়। যার সেট নং – কউ । আটিয়াবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাথে মিরজাগঞ্জ দ্বিমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীর জীববিজ্ঞান সৃজনশীল প্রশ্নের হুবহু মিলে যায় । যার সেট নং ঝউ এবং মাহিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাথে নবম শ্রেণীর গণিত সৃজনশীল প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ জোর দাবি করে বলেন , আমরা নিজেরাই প্রশ্নপত্র তৈরি করেছি । প্রশ্নপত্র মিল পাওয়ার কথা জানালে বড় রাউতা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিনেশ চন্দ্র রায় বলেন , প্রশ্নপত্র মিলেছে তাতে কি হয়েছে ? সমস্যাটা কি?

শালমারা বছিরন নেছা স্কুল এন্ড কলেজের প্রতিষ্ঠান প্রধান হামিদা বেগম স্বীকার করেন প্রশ্নপত্র তৈরী করেন নি বাজরের কেনা প্রশ্নপত্র দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে ।
ডোমার বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবিউল আলম বলেন , আমরা নিজেই প্রশ্নপত্র তৈরি করেছি কিন্তু পান্ডুলিপি দেখাননি ।

হংসরাজ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রধান হীরেন চন্দ্র রায় বলেন নিজেই প্রশ্ন পত্র তৈরি করেছি কিন্তু পান্ডু লিপি দেখতে চাইলে কোন পান্ডু লিপি দেখান নি , বলেন কোথায় আছে দেখতে হবে ।

বাগডোকরা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জগদীশ চন্দ্র বর্মন বলেন, বিচিত্রা বিপনি ডোমার , মোসলেম ভাইয়ের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র কিনে নিয়ে আসি।
সোনারায় উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমনী কান্ত রায় বলেন , ডোমারের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারবে না । কারন প্রশ্নপত্র তৈরি করা খুবই ব্যায়বহুল ।

আটিয়াবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয় , জামির বাড়ী বালিকা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বামুনিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় , মিরজাগঞ্জ বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় , বাগডোগরা উচ্চ বিদ্যালয় , মাহিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় , হলহলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় , শালমারা বছিরননেছা স্কুল এন্ড কলেজ , সোনারায় উচ্চ বিদ্যালয় , নীলফামারী সদরের কচুয়া চৌরঙ্গী সেবা স্কুল এন্ড কলেজ , ককই বড়গাছা পিসি উচ্চ বিদ্যালয় , পলাশবাড়ী পরশমনি দ্বিমূখী উচ্চ বিদ্যালয় এর প্রধান গণ নিজেই প্রশ্ন তৈরি করেছেন বলে জোর দাবি করেন । তবে পান্ডুলিপি দেখতে চাইলে তারা কেউ পান্ডুলিপি দেখাননি।
ুু
গোমনাতি হাজী তছিরউদ্দিন দাখিল মাদ্রাসা , খানকায়ে কেরামতিয়া শরীফ দাখিল মাদ্রাসার প্রশ্নপত্রে প্রতিষ্ঠানের কোন নাম পর্যন্তও নেই ।

মীরজাগঞ্জ বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান আমার প্রতিষ্ঠানের মোট ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা ১১০০ জনেরও অধিক । মোট পরীক্ষা দিয়েছে ১০২৩ জন । ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২০০-২৫০ টাকা । দেখা যায়, এতে আনুমানিক ২০০ করে প্রতি ছাত্র ছাত্রীর কাছ থেকে মোট ২ লক্ষ ৪ হাজার ৬ শত টাকা উত্তোলন হয়। এই টাকা উত্তোলন করার পরও এই প্রতিষ্ঠান প্রধান বাজারের স্বল্পমূল্যে কেনা প্রশ্নপত্র দিয়ে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা নিয়েছে। তারপরও জোর দাবি করে বলেন আমরা প্রশ্নপত্র নিজেই করেছি।

এ বিষয়ে ডোমার উপজেলা শিক্ষা অফিসার শাকরিনা বেগমের সাথে অফিসে গিয়ে কথা হলে তিনি বাজারের কেনা প্রশ্নপত্রটির কথা স্বীকার করেন । এ বিষয়ে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না , আপনি কি ব্যবস্থা নিয়েছেন জানতে চাইলে , তিনি বলেন , আমি শিক্ষকদের নিয়ে ক্যাম্পেইন করেছি এবং রুটিন মাফিক বিদ্যালয়গুলোতে মনিটরিং বাড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু ডোমার উপজেলা শিক্ষক সমিতি খুবই শক্তিশালী , আমার একার পক্ষে সম্ভব নয় । এ বিষয়ে আমি উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে মৌখিক ভাবে জানিয়েছি। তবে লিখিত ভাবে জানাইনি ।

নীলফামারী জেলা শিক্ষা অফিসার শফিকুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন , এই ভাবে যদি কেউ বাজারের কেনা প্রশ্নপত্র দিয়ে পরীক্ষা নিয়ে থাকে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দায়িত্ব জ্ঞান হীন ভাবেই নেওয়া হল পরীক্ষা। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে এর কোন সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি প্রতিষ্ঠান গুলোর প্রধান । নীলফামারী সদর ও ডোমার উপজেলার এই কতিপয় প্রতিষ্ঠানে ঘুরে যদি এই চিত্র পাওয়া যায় তাহলে বাকি প্রতিষ্ঠানের কি অবস্থা তা বুঝতে কারোই বাকী নেই ? এই যদি পরীক্ষার ভেতরের বাস্তব চিত্র হয়ে থাকে তাহলে আমাদের ছেলে মেয়েরা কি শিখবে ? শিক্ষার গুনগতমান কোন পর্যায়ে যাচ্ছে ?

এ বিষয়ে অভিভাবক রমনী চন্দ্র রায় বলেন, পরীক্ষার ফি বাবদ আমি ২২০ টাকা আমার মেয়েকে দিয়েছি । স্কুলের শিক্ষকরা যদি পরীক্ষার প্রশ্ন পত্র তৈরি না করে থাকে তাহলে করে কারা ? এই যদি হয় পরীক্ষার অবস্থা তাহলে আমাদের ছেলে মেয়েরা কি শিখছে ?

সরকার শিক্ষকদের বেতন ভাতা বাড়ানোর পড়েও যদি সৎ ইচ্ছা ,দায়িত্ব বোধ, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম , প্রজ্ঞা ,সহমর্মিতা না জাগে তাহলে শিক্ষার মানদন্ডে গুনগত মান থাকবে না , এ বিষয়ে অভিভাবক মহলে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সময় থাকতে এসব বিষয়ের প্রতি উর্ধতন কর্তৃপক্ষ যদি কোন পদক্ষেপ গ্রহন না করেন, পরবর্তীতে লাগাম টেনে ধরা মুসকিল হয়ে দাঁড়াবে।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *