পলাশবাড়ীতে খনন অভাবে মরে যাচ্ছে খরস্রোতা করতোয়াসহ নদী-নালা-খাল-বিল

পলাশবাড়ীতে খনন অভাবে মরে যাচ্ছে খরস্রোতা করতোয়াসহ নদী-নালা-খাল-বিল

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল,গাইবান্ধা ঃ মরে যাচ্ছে পলাশবাড়ীর খরস্রোতা করতোয়াসহ নদী-নালা-খাল-বিল। হচ্ছে চাষ মাছের বদলে ধান। চির ঐতিহ্যখ্যাত করতোয়া নদীর অববাহিকা এখন শুধুই নীরব-নিস্তবদ্ধতা। নেই কোন জলকেলির-স্রোতধারা। এখন দু’চোখ যতদুর যায় শুধুই সবুজের সমাহার। নদী শাসন প্রচলিত থাকলেও করতোয়া নদী যেন সেদিক থেকে চির অবহেলিত। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য নিকটাতীতে এই নদীর পানি সেচ দিয়ে তীরবর্তী আবাদি জমি চাষ করা হলেও আজ সেই নদীর বুক চিঁরে রোপন করা হচ্ছে বোরোসহ নানা ফসলাদি।
করতোয়া নদীর স্রোতধারায় উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার ভৌগলিক এলাকার বুক চিঁড়ে প্রবেশ করেছে বগুড়া জেলায়। নিকটাতীতে করতোয়া নদী প্রবাহের গতি ছিল অবিস্মরণীয়। এক সময় নদীর গভীরতা-জলস্রোতের তীব্রতা ছিল প্রখর। মাছ শিকার ছিল নদী তীরবর্তী জেলে পরিবার, উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তসহ নানাশ্রেণী-পেশার মানুষের আয়ের উৎস। প্রাকৃতিক কারণেই নদীতীরবর্তী বসবাসকারীদের মাঝে ছিল প্রাণের উচ্ছাস। আজ সবই যেন কেবল স্মৃতি। অতীতের নদী মাতৃক গালগপ্প নব-প্রজন্মদের মধ্যে আর মুখে-মুখে ঘুরে ফিরছে না। উপরোক্ত জেলাগুলোর ভৌগলিক সিমানায় প্রবাহিত করতোয়া নদী উল্লেখিত জেলা-উপজেলায় এবং স্থান বিশেষে কোথাও করতোয়া-আবার কোথাও আখিরাসহ অন্যান্য নামে পরিচিত।
পার্শ্ববর্তী রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ভৌগলিক সিমানায় করতোয়া অববাহিকা আখিরা নামে পরিচিত। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট ও গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার বুক চিঁড়ে পার্শ্বপবর্তী বগুড়া জেলায় প্রবেশ করেছে করতোয়া। মূলতঃ মাইলের পর মাইল দীর্ঘ পথ পেরিয়ে করতোয়া নদী শুধু নিজ জেলা-উপজেলা নয়। নামের সুবাদে করতোয়া দুনিয়ার সর্বত্রই ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। এক্ষেত্রে করতোয়া নদীর বর্তমান দুঃখ-দুর্দশা, জীবন-যৌবন, উন্নয়ন ও সমস্যা-সম্ভাবনার আলোচনা নিয়ে যেন কারোরই কোন মাথা ব্যথা নেই। নদী শাসনে স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি-মন্ত্রী-এমপিদের কথার সাথে কাজের কোন মিল না থাকায় সময়ের ব্যবধানে করতোয়া নদীর বুকে এখন চাষ হচ্ছে গম-ভুট্টা, ধান ও নিষিদ্ধ তামাকসহ অন্যান্য ফসলাদি। এতে একদিকে উন্নয়ন ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারিয়ে ঘটছে নানা বিপর্যয়। ফলে; সময়ের ব্যবধানে নদী তীরবর্তী জনবসতি আজ প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ নানামুখি সমস্যায় জর্জরিত। মুখ থুবরে পড়েছে সার্বিক আয়-উন্নতি।
করতোয়া নদী বিধৌত এলাকাবাসীর অর্থনৈতিক দৈন্যতা যেন আজ চিরস্থায়ী হিসেবে জেঁকে বসেছে। প্রতি বছর মৌসুমী বন্যায় করতোয়া নদী ধারণ করে ভয়াবহ রূপ। নদী তীরবর্তী জনবসতিদের বসতবাড়ী-জানমাল ও ফসলের ক্ষতি সাধন করলেও নানাবিধ উপকারের ছিলনা কোন কমতি। বছরের পর বছর নদীর তলদেশ বালু চরে ভরাট হয়ে উঠেছে। আর এ জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে নদী খনন। যতদূর চোঁখ যায় শুধু ধূ-ধূ বালুচর। নদীর একুল ভাঙ্গে-ওকুল গড়ে এই তো নদীর খেলা। ভাঙ্গা-গড়ার চির খেলার মধ্য দিয়েও মানুষের মাঝে ছিল অফুরন্ত স্বস্তি। ‘দিন যায়-কথা থাকে’ ঠিক তেমনি অতীতের সেই দিনগুলি কথার মতই রয়ে গেছে। ফুরিয়ে গেছে নদী-খাল-বিলের ভবিষ্যত। বৈচিত্রময় নদীর কথকথা আজ অন্ধকারে নিজ্জিত। কালের বিবর্তনে আবাদী জমি-জমা নদী গর্ভে বিলিন হওয়ায় আজ অনেকেই পরিণত হয়েছে ভূমিহীনে। কি বিচিত্র প্রাকৃতিক লিলা-খেলা। যেখানে নদীর পানি দিয়ে উপরের জমি চাষ করা হত। আজ গভীর-অগভীর নলকুপ-স্যালো-টিওবয়েলের মাধ্যমে খোদ নদীগর্ভে সেচ দিয়ে চাষাবাদ করা হচ্ছে। কোথাও-কোথাও সামান্য পানির দেখা মিললেও নদীর অধিকাংশ এলাকা জুড়ে এখন পানি শূন্য। নদীর তলদেশ ফেঁটে চৌচিঁর।
‘নদী বাঁচাও-দেশ বাঁচাও’ শ্লোগানে-শ্লোগানে নদী এলাকার ভূক্তভোগী বসতিদের মাঝে চলছে চরম আর্তনাদ। তাদের প্রশ্ন এ সমস্যার সমাধান কি আদৌ বাস্তবায়ন হবার নয়। বছরে ৩ মাস পানি থাকলেও ৯ মাসেই থাকে পানি শূন্য। এ অবস্থা চলছে দীর্ঘ বছর ধরে। দীর্ঘদিন কোন নদী খনন নেই। সরকারের দৃষ্টি প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন। ফলে করতোয়া নদী এখন পুরোপুরি মরা খালে পরিণত হচ্ছে। শুধু তাই-ই নয় পরবর্তীতে এলাকার উন্নয়নে নদী ব্যতিত পৃথক খননকৃত খালও ভরাট হয়ে উঠেছে। উপজেলার মোলায়েমখালি-নলেয়াখাল ছাড়াও অন্যান্য খাল-বিল সবই আজ ভরাট হয়ে গেছে। এক সময় এসব স্থান দিয়ে একের পর এক সারি-সারি নৌকার বহর চলাচল চোঁখে পড়লেও আজ তা কেবলই স্মৃতি। জলবায়ুর প্রতিক্রিয়ায় ক্রমান্বয়ে করতোয়া নদী ভৌগলিক মানচিত্র থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। এসব খাল বিল ও নদীর বুক বেয়ে মানুষ পায়ে হেঁটে পথ চলছে। নদী নৈস্বর্গিক পরিবেশ ও অস্তিত্ব আজ বিলীন হয়ে যেতে বসেছে। নদী ও মানুষের সেই চিরচেনা সম্পর্কের কথকথা যেন দিন-দিন পাল্টে যাচ্ছে। জীবন-জীবিকার অম্বেষনে এলাকার জেলে স¤প্রদায়সহ মাছ শিকারের সখ্যতা ছাড়াও চিরঐতিহ্য বাপ-দাদার পেশা পরিবর্তন করে আজ অনেকেই ভিন্ন পেশার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *