বীরগঞ্জে জীবন যুদ্ধে জয়ী চার জয়িতাদের সফল হওয়ার গল্প

বীরগঞ্জে জীবন যুদ্ধে জয়ী চার জয়িতাদের সফল হওয়ার গল্প

খায়রুন নাহার বহ্নি, বীরগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি ঃ মানুষের জীবনে চলার পথে আসে নানা ধরনের বাধা কিন্তু তাই বলে কি জীবন থেমে থাকে অনেকই আছেন যারা সব বাধা মোকাবেলা করে এগিয়ে যান সমানের দিকে অর্জন করেন সফলতা। হয়ে উঠেন একজন সংগ্রামী জয়িতা। নিজের অদম্য মনোবল সম্বল করে চরম প্রতিকূলতাকে জয় করে জয়িতারা তৃণমূল থেকে সবার অলক্ষ্যে সমাজে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করেন। দিনাজপুরের বীরগঞ্জে এমনই চারজন নারী যারা সব ধরনের বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে সফল হয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন সমাজে জয়িতা নামে। শিক্ষা ও চাকরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী সুলতানা রাজিয়া বীরগঞ্জ উপজেলার সাতোর ইউনিয়নের গড়পাড়া গ্রামের আব্দুল আজিজের স্ত্রী। সে খুব কষ্টে এস.এস.সি পাশ করে মহিলা কোটায় চৌপুকুরিয়া আদিবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ পেয়ে কর্মরত আছেন। চাকুরীরত অবস্থায় এইচ.এস.সি পাশ করেন। সফল জননী নারী জাহেদা বেগম গড়পাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলামের স্ত্রী। আজ থেকে ৩০ বছর পূর্বে বিয়ে হয় একই উপজেলার অতিদরিদ্র দিনমজুরের ছেলের সাথে দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করার জন্য মানুষিকভাবে প্রস্তুতি নেয়। সংগ্রাম জীবনে পা দেওয়ার ৩ বছরের মাথায় ১ টি পুত্র সন্তানের জননী হয়। অতি কষ্টে দুজনেই অন্যের বাড়ীতে মজুরি দিয়ে সংসারে দুখের দিনগুলি কাটায় এরেই মধ্যে আরেকটি সন্তান গর্ভে আসে। গর্ভে সন্তান আসার ৫ মাস পর জাহেদা অসুস্থ হয়ে যায়। সেই কারণে তাদের বসত ভিটাটুকু বিক্রি করে চিকিৎসা করা হয়। চিকিৎসা করানোর পর সে অসুস্থ হয়ে ১টি কন্যা সন্তান প্রসব করে। আবারো জাহেদা শুরু করে অন্যের বাড়ীতে গৃহপরিচারিকার কাজ। আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে ছেলে মেয়ে দুটি। শুরু হয়ে যায় তাদের লেখাপড়া। হিমসিম খায় জাহেদা ও তার স্বামী রফিকুল। এক পর্যায়ে জাহেদা এনজিও থেকে ঋণ গ্রহণ করে তার স্বামীকে চায়ের দোকান ধরিয়ে দেন এবং নিজেই পরের বাড়ীর কাজ এবং নিজ সংসার ও দোকানের কাজ একাই হাতেই সামাল দিতেন। এসব করেই তিনি একমাত্র মেয়েকে স্নাতকোত্তর পাস করান। বর্তমানে ছেলে ব্যবসা করে এবং মেয়ে ১টি এনজিও তে চাকরী করেন। তার এই সফলতা দেখে গ্রামবাসী অবাক এবং জাহেদাকে বলে অর্থের কিছু নাই। তবুও আমি অনেক সুখি। আমার ছেলে মেয়ে দুজনই শিক্ষিত ও কর্মরত। নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যম জীবন শুরু করেছেন যে নারী তার নাম নাসিমা খাতুন ভোগনগর ইউনিয়নের চাউলিয়া গ্রামের মোঃ হেলাল উদ্দীনের স্ত্রী। বিয়ের পর কিছুদিন তাদের সংসার ভালো চলে। একপর্যায়ে নাসিমার গর্ভে সন্তান আসে এবং তার স্বামী তখনই শুরু করে তার প্রতি অমানবিক নির্যাতন। একপর্যায়ে তার স্বামী তার খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেন। তখন বাধ্য হয়ে নাসিমা বাবার বাড়ীতে আশ্রয় নেয় এবং ১টি কন্যা সন্তানের জননী হয়। কন্যা সন্তানের মা হওয়ার পর স্বামী তার কোন প্রকার খোজ-খবর নেন নি। বাধ্য হয়ে ১ বছর পর নাসিমা ব্রাক অফিসে অভিযোগ করে এবং তার স্বামী তাকে অঙ্গিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে যায়। নিয়ে গিয়ে তাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করলে নাসিমা বুঝতে পারলে মেয়েকে নিয়ে অন্যের বাড়ীতে আশ্রয় নেয় এবং বাবার বাড়ীতে চলে আসে। ১ বছর অন্যের বাড়ীতে কাজ করে নিজের এবং সন্তানের ভোরন পোষণ জোগার করেন। ২ বছর পর সন্তানকে মায়ের কাছে রেখে পারি জমান ঢাকায়। সেখানে ৪ বছর কাজ করে ৫ শকত জমি কিনে বাড়ী করেন, মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করেন। গরু, ছাগল পালন করে। পরের বাড়ী কাজ করে মেয়ের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। তার স্বামী আবার অনত্র বিয়ে করে সংসার যাপন করছেন। স্বামীর সাথে তার আর কোন যোগাযোগ নাই। নিজের প্রচেষ্টায় তিনি এখন অনেক ভালো আছেন। সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী বীরগঞ্জ উপজেলার শতগ্রাম ইউনিয়নের মদাতি গ্রামের মোঃ আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী মোছাঃ তাহারিমা বেগম (৪৮)। লেখাপড়ার ইচ্ছা থাকলেও লেখাপড়া শেষ করতে পারেনি কোনমতে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল। তার বাবার কথা হল পরিবারের মেয়ারা বেশি পড়াশোনা করে কি করবে ? যতই পড়াশোনা করুক না কেন তোমাকে ওই ভাতের হাড়িতেই থাকতে হবে। নারী বলে সমাজে কোন দাম নেই। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে সম্ভাবনাময় কিছু থাকে তেমনি ছিল মোছাঃ তাহারিমা বেগমের মধ্যে ছোট বেলা থেকে প্রতিবাদী মনোভাব ছিলো। সব কাজে সক্রিয়াত ছিল এবং কথা বলে দৃঢ়তার সাথে। সে প্রমান করতে চায়, নারীরাও অনেক কিছু করতে পারে। এরই মধ্যে যুক্ত হয় বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সাথে বিভিন্ন ধরনের সচেতনতা মূলক বিষয় ও দক্ষতা মূলক প্রশিক্ষন পেয়ে থাকে যা তার সামনে এগিয়ে যেতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়ায় সহযোগীতা করে। স্বামীর বাড়ীতে এসে তবুও থেমে থাকেননি। বারবার বাধা দেওয়ার পরেও সকল বাধাকে অতিক্রম করে আজ সমাজে উন্নয়নের অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে। হতদরিদ্রদের তালিকা (১) বয়স্কভাতা পেতে সাহায্য করেছেন ১ জনকে। (২) বিধবা ভাতা প্রাপ্তিকে সহায়তা করেছেন ১ জনকে। (৩) ভিজিএফ কার্ড প্রাপ্তিতে সহায়তা করেছেন ২৭ জনকে। (৪) স্থানীয় শালিসে অংশগ্রহণ করেছেন ৩টি তে। (৫) প্রশিক্ষন প্রাপ্তিতে সহায়তা করেছেন ৪২ জনকে। ( আধুনিক দর্জি বিজ্ঞান ও গার্মেন্টস, পাটি তৈরি, কৃষি ও হস্তশিল্প) (৬) বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের জন্য দরখাস্ত প্রদান । (৭) বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করেছেন ২টি। (৮) পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ ৬টি। বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান ভালো আছেন সমাজে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছেন। এলাকায় কোন সমস্যা হলে তার কাছে পরামর্শের জন্য আসেন। নিজ এলাকায় তিনি সকলের জন্ম নিবন্ধন, গর্ভ কালীন চেক-আপ, শিশুদের স্কুলগামী সহ উল্লেখ যোগ্য ৫৮ টি পরিবারের নারীদের নিয়ে ১টি বসার ঘর তৈরি করেছেন। সেখানে নারীরা মনখুলে কথা বলেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সামাজিক কমিটিতে আছেন। আগামীতে তিনি সমাজের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে চান এবং সমাজে মেয়েরা যেন কিছু করতে পারেন ও আগামীতে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *